২১শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ| ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ১৬ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি| সন্ধ্যা ৬:২০| বসন্তকাল|
শিরোনাম:
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ছে: ছুরিকাঘাতে আহত পুলিশ কনস্টেবল, কারা দিচ্ছে মদদ? দেবিদ্বারে রেজভিউল আহসান মুন্সির আগমন উপলক্ষে বিএনপির শোডাউন জিম্মি করে মঞ্জুরুল মুন্সির প্রাক্তন পুত্রবধূ বুবলি হতে চান এমপি;বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য ন্যায় বিচার পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মানবাধিকার কর্মী শুভ্র সদর দক্ষিণ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনার শীর্ষে ইঞ্জি: রিপন গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনার তুঙ্গে এটিএম মিজান চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় জামাল উদ্দিন দলীয় কার্যালয় খুলবেন বাহার একটি অত্যাধুনিক ও মডেল ইউনিয়ন গঠনে ফয়েজ আহমদ মুন্সির বিকল্প নেই চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় কবির হোসেন

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ছে: ছুরিকাঘাতে আহত পুলিশ কনস্টেবল, কারা দিচ্ছে মদদ?

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, এপ্রিল ৪, ২০২৬,
  • 8 Time View

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ছে: ছুরিকাঘাতে আহত পুলিশ কনস্টেবল, কারা দিচ্ছে মদদ?
নগরজুড়ে আতঙ্ক, প্রশ্নের মুখে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা:
কুমিল্লা নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে কিশোরদের চলাফেরা, মাদক সেবন, মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এখন প্রায়ই সংগঠিতভাবে কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে স্টেডিয়াম গ্যালারির পেছনের অংশ, ঈদগাহ মাঠ এলাকা এবং আরও কয়েকটি স্পটে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের আড্ডা, মাদক সেবন ও সন্দেহজনক তৎপরতা চলে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, অনেক সময় একসঙ্গে ৬০ থেকে ৭০ জন কিশোরকে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করতে দেখা যায়, যা নগরবাসীর মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
ধর্মসাগর পাড়ে হামলা: ছুরিকাঘাতে আহত পুলিশ কনস্টেবল
গত ২ এপ্রিল কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড় এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় এক পুলিশ কনস্টেবল ছুরিকাঘাতে আহত হন বলে জানা গেছে। ঘটনাটি নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এ ঘটনায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে দুই বখাটেকে আটক করা হলেও, সাধারণ মানুষের অভিযোগ—
সব ঘটনায় পুলিশ সমানভাবে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয় না।
স্থানীয়দের মতে, “যখন বড় কোনো ঘটনা ঘটে, তখন কিছুটা তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট সন্ত্রাস, ভয়ভীতি, ছিনতাই ও মাদকসেবনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা অনেক সময় চোখে পড়ে না।”
মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি—বাড়ছে অপরাধের তালিকা
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন শুধু আড্ডা বা বখাটেপনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তারা মাদকসেবন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
একাধিক অভিভাবক বলছেন, কিশোরদের একটি অংশ খুব দ্রুত অপরাধচক্রের প্রভাবের মধ্যে ঢুকে পড়ছে, অথচ পরিবার অনেক সময় তা বুঝে ওঠার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন,
“আমাদের সন্তানরা কখন কোন চক্রে জড়িয়ে পড়ছে, তা বুঝতেই পারছি না। এ অবস্থায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি খুবই প্রয়োজন।”
কারা দিচ্ছে আশ্রয়-প্রশ্রয়?
কুমিল্লার সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—
কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কারা রয়েছে? কারা তাদের অর্থ, সাহস, প্রভাব ও আশ্রয় দিচ্ছে?
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা প্রভাবশালী মহলের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করার একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। সেই সুযোগে এখন তাদের কেউ কেউ সংগঠিত অপরাধী চক্রে পরিণত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়া থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তারা সহজে আইনের আওতায় আসে না। ফলে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নগরবাসীর একটি বড় অংশ মনে করছেন, শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেই এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
বরং দৃশ্যমান, ধারাবাহিক, গোয়েন্দাভিত্তিক ও কঠোর তৎপরতা ছাড়া কিশোর গ্যাং দমন করা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ে থাকা সদস্যদের আটক করলেই হবে না;
যারা তাদের পেছন থেকে পরিচালনা করছে, অর্থ দিচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে এবং ব্যবহার করছে—তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
পুলিশ প্রশাসনের অবস্থান
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে, তাদের অপরাধে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা—
ঘটনা ঘটার পর নয়, বরং আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ বাড়ানো হোক।
সিটি প্রশাসকের বক্তব্য
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন,
“কিশোর গ্যাং একটি সামাজিক ব্যাধি। তরুণ সমাজকে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব, তবে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব তাদের অভিভাবকদের। আমরা প্রথমে কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা করব, তাদের ঠিকানায় গিয়ে বুঝিয়ে-শুনিয়ে শৃঙ্খলার পথে ফেরানোর চেষ্টা করব। যদি তারা সঠিক পথে না আসে, তাহলে পরবর্তীতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তার এই বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন অনেকেই। তবে সচেতন নাগরিকদের দাবি, শুধু তালিকা করলেই হবে না—তা যেন বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়।
সমাধান কোথায়?
সচেতন নাগরিক, শিক্ষক, অভিভাবক ও সামাজিক সংগঠকদের মতে, কিশোর গ্যাং সমস্যার টেকসই সমাধান শুধু ধরপাকড় বা গ্রেপ্তারে সম্ভব নয়।
এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ।
সমাধানে যেসব পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তারা:
পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কঠোর নজরদারি
সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা
খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা
ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য পুনর্বাসনমূলক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
মাদক ও অপরাধচক্রের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বড় হুমকি
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে কুমিল্লা নগরীতে কিশোর গ্যাং ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক, নৈতিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা—
কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে, আর যারা তাদের ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category